You are currently viewing বুক রিভিউঃ কাজল (তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)
book review kheyaliBD kajol by taradas bandopadhay

বুক রিভিউঃ কাজল (তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)

বইঃ কাজল

লেখকঃ তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশনঃ মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স 

ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯.৫০  

যারা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালি,  অপরাজিত পড়েছেন তাদের মনের মধ্যে একটা আফসোস থেকেই গেছে অপুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানার জন্য। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মুলত পাঠকদের অতি উৎসাহী মনকে অবদমন করার জন্য কাজল বইটি লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বইটি লেখার জন্য সকল প্রস্ততি শেষে বলা চলে খুব অল্প বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে পারি জমান। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর একমাত্র ছেলে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তার মায়ের অনুপ্রেরনায় কাজল বইটি লেখার ইচ্ছে পোষন করেন। কিন্তু কালজয়ী একজন লেখকের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা মোটেও সহজ ছিলনা। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বইটি লেখার সময় যে একদম আপ্রান চেষ্টা করেছিল সেই প্রমান বইটি পড়লেই বুঝতে পারবেন। আপনার মনে হবে আপনি বিভূতিভূষণ এর লেখাই পড়ছেন। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অবিকল বাবার লেখার ধাচ পেয়েছেন। তার বাবার মতই সুন্দর সাবলীল ভাষার মাধ্যমে সামান্য ঘটনা গুলোকে অসামান্য করে তুলেছেন। 

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ

কাজল পড়ার সময় আমার একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে এটা বিভূতিভূষণ এর লেখা নয়। তবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই বইটি লেখার সুযোগ পেলে হয়তো ছোটবেলাকার নিশ্চিন্দিপুর আর কাজলের সময়কার নিশ্চিন্দিপুরের প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যেত। সবথেকে বেশি ভাললেগেছে অপুর তার প্রথম স্ত্রী অপূর্ণার প্রতি অকৃত্তিম ভালোবাসা। এতগুলো বছর একা থাকার পরেও হৈমন্তিকে বিয়ে করার আগে অপূর্ণার কথা ভেবেছে। তার জায়গা হৈমন্তিকে দিতে পারবেনা নিশ্চিত করে তবেই বিয়ে করেছে। আর খারাপ লেগেছে কাজলের দিনদিন হতাশ হয়ে পরা। যে জীবনকে এত সুন্দর করে দেখতে পারে, ভাবতে পারে সে জীবনের অর্থ খুজে পাবে না কেন? তার মা হৈমন্তির জন্য সুখ খোজা, বাবার স্মৃতিকে আকরে ধরে বেচে থাকা কি জীবনের লক্ষ্য হতে পারেনা? 

কাজল থেকে প্রিয় উক্তিঃ

জীবনকে যে জানিয়াতে পারিয়াছে, মৃত্যুকে তার ভয় কী? _অপু

সন্ধানেই আনন্দ প্রাপ্তিতে পরিসমাপ্তি। _হৈমন্তি

চেনা মুখের ভীড়ে একলা থাকা বড়ই কষ্টের। _কাজল

এত দীর্ঘ দিন বেচে থাকার মানে কী? এত কষ্ট করে পড়াশোনা করা, জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, জীবনকে ভালোবাসা  এর অর্থ কী? মৃত্যুর পরতো একটা ভয়ানক অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে নেবেই।  _ কাজল 

কাহিনী সংক্ষেপঃ

যারা অপরাজিত পড়েছেন তারা জানেন যে অপুর যখন একটি ছেলে হয় আতুরঘরেই অপুর স্ত্রী মারা যায়। তারপর অপরাজিতর শেষাংশে দেখা যায় অপু তার ছেলে কাজলকে তার সেই নিশ্চিন্দপুরের রানী দিদির কাছে সপে দিয়ে দেশভ্রমনে বেড়িয়ে পড়েন। তারপর ফিজিতে একটা মিশনারী স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করে আফ্রিকায় চলে যান। সেখানে সমূদের পারে সারারাত ধরে গ্রহ নক্ষত্ররাজির সাথে তার সময় কাটতো কিন্তু তারপরেও তার মনের মধ্যে কিসের যেন অভাব বোধ হতো। সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ছেলে কাজলের কথা ভিষন মনে পরতো। অবশেষে ছেলের টান উপেক্ষা করতে না পেরে সমূদ্রের ফেনোচ্ছল ঊর্মিমালা, বিষুব মন্ডলীর দেশের তারকাখচিত তমিস্র রাত্রির আকর্ষন, উষ্ণ বালুকায় শুইয়া উপরে নারিকেল পাতায় বাতাসের মর্মরধ্বনীর অদ্ভুত অনুভুতি সবকিছু ফেলে কাজলের কাছে ছুটে যায়। অপু বাবা হয়ে তখন প্রথম বুঝতে পারে তার বাবা হরিহর তাকে ছেড়ে থাকতে কত কষ্ট পেয়েছিলেন। কাজলের চিন্তাভাবনা,  আচরন সবকিছু ভালভাবে পর্যক্ষন করলে ছোটবেলার সেই অপুর সাথে হুবহু মিল পাওয়া যায়। কাজল অবিকল বাবার আদলেই বেড়ে উঠতেছিল। সারাদিন নিশ্চিন্দিপুরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত। একদিন রামদাস নামে এক বোষ্টমের সাথে পরিচয় হয়। কতজা বলে কাজলের অনেক ভাল লাগে। নিশ্চিন্দিপুরে কিছুদিন থাকার পর কাজল কে ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য সেখান থেকে খানিকদূরে মালতিনগরে যান। 

মালতিনগরে একটি বাসা ভাড়া করে কাজলকে নিয়ে সেখানে থাকা শুরু করে। খুব অল্পদিনের মধ্যে অপুর লেখক হিসেবে পাঠকদের মনে সারা জাগান। নামকরা প্রকাশনী এবং পত্রিকার মালিকেরা অগ্রিম টাকা দিয়ে লেখার জন্য তাড়া দিতে শুরু করলেন। ফলে খুব দ্রুত  আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। সেখানে হৈমন্তি নামে একজন ভক্তের সাথে সখ্যতা হওয়ার পর তার প্রেমে পরে যান। অপু তার স্ত্রী অপর্ণার স্থানে হৈমন্তিকে বসাতে না পারলেও হৈমন্তির জন্য নতুন স্থান তৈরি করে তাকে বিয়ে করে। হৈমন্তিও ছোটখাটো একজন লেখিকা।  অপুর বাবা হরিহর যেমন একজায়গায় বেশিদিন টিকতে পারতেন না তেমনি অপু এবং পরবর্তীতে দেখা যায় কাজলের মধ্যেও এই বাউণ্ডুলে স্বভাব লক্ষ্য করা যায়। মালতিনগরের চাকচিক্য খ্যাতি ছেড়ে আবার শিকরের টানে নিশ্চিন্দিপুরে হৈমন্তি কাজলকে নিয়ে ফিরে যান। কিন্তু সেখানে কিছুদিন থাকার পর অপু অসুস্থ হওয়ায় হাওয়া বদল এবং একজায়গায় ভাল না লাগার জন্য মৌপাহাড়ী নামক একটি জায়গায় বাড়ি কিনে সেখানে পরিবার নিয়ে চলে যান। কিন্তু মৌপাহাড়ীতে আসার কয়েক বছরেও শরীরের কোনো উন্নতি পায়না। অপু বুঝতে পারে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু নিশ্চিত হয় ছেলে কাজল একদিন অনেক বড় হবে এবং তার মাকে দেখেশুনে রাখবে। হৈমন্তিও কখনো কাজলকে তার মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। 

মৌপাহাড়ীতে এসেও অপু অনেক সুখ্যাতি অর্জন করে লেখক হিসেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার জীবন বিস্বাদে পূর্ন হয়ে যায়। সুবর্ণরেখা নামক একটি জায়গায় একটা বড় পাথরে বসে অপু লিখত সেখানেই একদিন বেড়াতে এসে চিরনিদ্রায় তলিয়ে যান। কাজল এবং স্ত্রী হৈমন্তি অনেক বড় আঘাত পায়। তারপর সেখান থেকে কাজল এবং হৈমন্তি একে অন্যের অবলম্বন হয়ে আবার মালতীনগর অর্থাৎ হৈমন্তির বাবার বাড়িতে চলে আসে।  কাজলে হৈমন্তির বাবা মা পরিবারের সবাই অনেক ভালবাসতো। হৈমন্তির বাবা সুরতিপতিবাবু বুঝতে পারতেন কাজল একদিন তার বাবার মতই বড় হবে। সেখানে কাজল স্কুলের পাঠ চুকে তার বাবার কলেজেই ভর্তি হয়। ছোটবেলা থেকে কাজল সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা করত না। তার বয়সী ছেলেদের সাথে চিন্তাভাবনার কোনো মিল খুজে পেতনা বলেই সারাদিন বই কখনো শহর ছেড়ে দূরে লোকালয়ে আপন মনে ঘুরে বেড়াত। সেখানে গ্রামের বিভিন্ন মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে গল্প করতো কখনো বা বইয়ে পড়া বিভিন্ন গল্পের কথা ভাবতে থাকত। মালতিনগরে তার স্কুলের এক অদ্ভুত চরিত্র ব্যোমকেশ এর সাথে পরিচয় হয়। ছোটবেলায় অপুর মনে মানুষের জীবন,  প্রকৃতি নিয়ে যে চিন্তার সঞ্চার হয়েছিল তারই প্রতিফলন কাজলের জীবনেও দেখতে পাওয়া যায়। এতটুকু জীবনে বাবার মৃত্যু এবং তার নানা হৈমন্তির বাবার মৃত্যু তাকে ভাবান্তর করে তুলে। সে জীবনের অর্থ খুজে পায়না। পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে কিন্তু তার মায়ের কথা ভেবে কষ্টে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। কাজল মাকে শান্তি দেয়ার অভিপ্রায় দিয়ে মাকে নিয়ে আবার সেই মৌপাহাড়ীতে মাষ্টারি করে তার মাকে নিয়ে কাটিয়ে দিতে চায়। কাজল একদিন জাদুঘর থেকে ফিরে আসার সময় আবার রামদাসের দেখা পায়। কিছু লোক রামদাসকে ধরে মারতেছিল। সেখানে যাওয়ার পর রামদাসকে উদ্ধার করে রাস্তায় হাটতে থাকে। জানতে পারে রামদাসের যক্ষা হয়েছে। রামদাসের সাধারন জীবন অর্থের প্রতি অনাগ্রহ,সততা  কাজলের কাছে অনেক ভাল লাগে। চিকিৎসার জন্য রামদাসকে কিছু টাকা দেয় জোর করে । তারপর রামদাস গুনাগুন করতে করতে আবার চলে যায়।  গল্পের শেষে দেখা যায় কাজল তার ডায়েরীতে লিখেছে সে আবার তার মাকে নিয়ে নিশ্চিন্দিপুর যেতে চায় তার বাবার স্মৃতিকে সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখার অভিপ্রায় নিয়ে। 

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply